২ বছরে ১৫ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন সাবরেজিস্ট্রার

 

কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের সাবরেজিস্ট্রার কাইয়ুম মজুমদার টানা ২ বছর কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা ঘুস নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘুসের রাজাখ্যাত এ সাবরেজিস্টারের বিরুদ্ধে সেবাগ্রহীতাদের ক্ষোভ অনেক। কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বলয়ে থাকায় তাকে নিয়ে সমালোচনার সুযোগ কম। দলিল লেখক, রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তিনি অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করে রেখেছেন।

এদিকে প্রবাসী অধ্যুষিত ওই এলাকায় দলিল দাতা-গ্রহীতারা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে অনেকটাই জিম্মি। এমনকি ঘুসের হাত থেকে রেহাই পাননি গণমাধ্যমকর্মীরাও। অপরদিকে যুগান্তরের অনুসন্ধান টের পেয়ে তিনি দ্রুত বদলি হতে দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

সরেজমিন জানা যায়, ২০২২ সালের ১২ জুন কাইয়ুম মজুমদার নাঙ্গলকোট সাবরেজিস্ট্রি অফিসে যোগ দেন। তিনি পাশের চান্দিনা উপজেলার বাসিন্দা। কয়েকজন দলিল লেখক এবং সেবাগ্রহীতা জানান, এ অফিসে সরকারি ফির বাইরে প্রতি দলিলে সেরেস্তার নামে ঘুস নেওয়া হয় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। দলিলের টিপসই বাবদ ১শ টাকা। প্রতিটি দলিলের নকল স্বাক্ষর করতে সাবরেজিস্ট্রারকে দিতে হয় অতিরিক্ত ১২শ টাকা। এছাড়া বণ্টননামা, শ্রেণি পরিবর্তন দলিল, ত্রুটিযুক্ত দলিল করতে আলোচনা সাপেক্ষে ঘুস নিয়েছেন তিনি। চাহিদা অনুসারে ঘুস না পেলে তিনি ছোটখাটো ভুল খুঁজে বের করেন। ঘুসের চাহিদা পূরণ হলে আয়কর সনদ না থাকলে কোনো সমস্যা হয় না।

এ সাবরেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি মাসে গড়ে দলিল রেজিস্ট্রি হয় ১ হাজারের বেশি। দলিলের নকলে স্বাক্ষর হয় প্রায় ১ হাজার। গত ২ বছরে দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার। হিসাব করে দেখা যায়, এসব দলিল থেকে শুধু সেরেস্তা বাবদ নেওয়া হয়েছে (সাবরেজিস্টারের ঘুস) প্রায় ৮ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। নকলে স্বাক্ষর বাবদ প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ, টিপসই বাবদ ২৬ লাখ ৪০ হাজার ও বিভিন্ন অজুহাতসহ সব মিলিয়ে প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৬০-৭০ লাখ টাকা ঘুস নেওয়া হয়। অফিস সহকারী শিরিনা আক্তার এবং উমেদার সেলিনা আক্তারসহ সাবরেজিস্ট্রারের ব্যক্তিগত দুজন ম্যাসলম্যান এসব ঘুসের টাকা আদায় করেন। সাবরেজিস্ট্রার নিজেই এ অফিসের দালাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। ত্রুটিযুক্ত দলিল নিয়ে সাবরেজিস্ট্রারের খাসকামরায় বৈঠক হয়। ওই অফিসে ৮৪ জন দলিল লেখক থাকলেও তাদের সহকারী রয়েছে আরও ৫ গুণ।

ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকার নাঙ্গলকোট প্রতিনিধি আবুল কাশেম গাফুরী বলেন, আমি একটা দলিল করতে গিয়ে সরকারি ফির বাইরে সাড়ে ৩ হাজার টাকা সেরেস্তা, আড়াই হাজার টাকা নকল ফি এবং ১শ টাকা টিপসই বাবদ ঘুস দিয়েছি। গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় দিয়েও রক্ষা পাইনি।

দলিল লেখক রুহুল আমীন ও সাদেক হোসেন বলেন, প্রতি নকলে ২ হাজার টাকা লাগে। টিপসই ১শ টাকা আর বাকি বিষয় আলোচনা সাপেক্ষে। এগুলো টেলিফোনে বলার বিষয় নয়।

উপজেলার করপাতি-দোয়ারিয়া গ্রামের আব্দুর রহিম জানান, কাগজে কিছু ত্রুটি থাকার ৪ শতাংশ জমির এক্স বদল দলিল করতে সাবরেজিস্টারকে ৩৫ হাজার টাকা ঘুস দিতে হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সাবরেজিস্ট্রার কাইয়ুম মজুমদার বলেন, আমি সরাসরি কারও কাছ থেকে ঘুস নিই না। আমার কোনো সহকারী ঘুস নিলে দায় আমার নয়। আমি যদি ১৫ কোটি টাকা ঘুস নিতাম তাহলে তো আমার অনেক বাড়ি-গাড়ি থাকত। আসলে আপনারা যা ভাবছেন তা নয়। একপর্যায়ে নিউজ না করার জন্য অনুরোধ করেন এ সাবরেজিস্ট্রার।

জেলা রেজিস্ট্রার আসাদুল ইসলাম বলেন, নাঙ্গলকোট সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো এসেছে অবশ্যই আমরা যথাযথ তদন্ত করব।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url

V 2

P

V